সততা ও সত্যবাদিতা রচনা

উপক্রমণিকাঃ

‘মরে না, মরে না কভু সত্য যাহা শত শতাব্দীর
বিস্মৃতির তলে–
নাহি মরে উপেক্ষায়, অপমানে না হয় অস্থির
আঘাতে না টলে।’

                                                                                                -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মানুষের আচরণগত মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে সততা ও সত্যবাদিতা অন্যতম। এ গুণ মানব চরিত্রকে মহিমান্বিত করে। সত্য ও বিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে মানুষ তার নিজেকে আবিষ্কার করে, মনুষ্যত্বকে অর্জন করে। বিশ্বসভ্যতার শুরু থেকে মানুষ সততা ও সত্যবাদিতার চর্চা করে আসছে। জাতীয় জীবনে সততা ও সত্যবাদিতার প্রতিফলন ঘটিয়ে মানুষ আজ সাফল্যের চূড়ায় অবস্থান করছে। তাই সত্যবাদিতার গুণ অর্জন করাই মানুষের নিরন্তর সাধনা হওয়া উচিত।

সততা ও সত্যবাদিতাঃ সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকাই হলো সততা আর সত্যের আলোকে পরিচালিত মানব গুণই সত্যবাদিতা। মানব জীবনের সকল সদগুণই সততা ও সত্যবাদিতার অন্তর্ভুক্ত। দৃঢ় চিত্তে, সাহসের সঙ্গে সত্যের পথ অবলম্বন করলে শাশ্বত কল্যাণ লাভ করা যায়।

সততা ও সত্যবাদিতার বৈশিষ্ট্য: সত্য আলোর পথ, মিথ্যা অন্ধকার। কোনো কিছুর যথাযথ প্রকাশ করা হলো সত্য অর্থাৎ কোনো কিছু গোপন না করে, মিথ্যা বা কল্পনার আশ্রয় না নিয়ে সম্পূর্ণভাবে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা হলো সত্য। আর সত্যের পথে পরিচালিত, সত্যকে প্রায়োগিক জীবনে প্রতিফলন ঘটিয়ে জীবনযাপন করা হলো সততা। সৎ পথে থেকে সত্যের পথ অবলম্বন করে সত্য প্রকাশ হলো সত্যবাদিতা। সততা ও সত্যবাদিতা মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ। সৎ ও সত্যবাদী ব্যক্তি কখনো মিথ্যা বলে না, কোনো কিছু গোপন করে না। মানুষের মধ্যে কুৎসা রটায় না। ন্যায় ও নীতির পথ অবলম্বন করে। অন্যায় কাজ করে না এবং অন্যায় কাজের সাথে আপোস করে না।

বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে সততার মূল্যায়নঃ সততা বিসর্জন দিয়ে মানুষ এখন নিজের স্বার্থ সাধনে তৎপর। এখন সমাজে এসেছে অবক্ষয়। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই আজ মনুষ্যত্বের দীনতার চিত্র। যুব সমাজকে নতুন চেতনায় উদ্দীপ্ত করার মতো আজ কোনো পরিকল্পনা নেই। বস্তুত সমাজের সর্বস্তরে আজ যে সততা, সত্যবাদিতা ও মূল্যবোধের অভাব, তার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া যুবকদের মাঝে প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে। সততা ও সত্যবাদিতা ছাড়া মানুষের কোনো গুণই বিকশিত হতে পারে না।

সততা ও সত্যবাদিতার সাধনাঃ সততা ও সত্যবাদিতার জন্য সাধনার প্রয়োজন। মিথ্যার বেড়াজাল ভেদ করে সত্যকে অবলম্বন করতে কঠোর সাধনা করতে হয়। পৃথিবীতে কোনো সত্য আপনা-আপনি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণ করতে কঠোর সাধনা করতে হয়। সত্যের সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়।

মানবজীবনে সততা ও সত্যবাদিতার আবশ্যকতাঃ সততা ও সত্যবাদিতা মানুষকে সুন্দর, সঠিক ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। আর যদি এ মহৎ গুণটি না থাকে তবে মানুষ হিংস্র হয়ে উঠে, তার ভিতরে পাপবোধ কাজ করে না। যখন-তখন যেখানে-সেখানে এ সব মানুষ অন্যায় কাজ করে সমাজ কলুষিত করে। মানবতা বলতে তাদের মধ্যে কিছুই থাকে না। জীবনে সফলতা লাভ করতে হলে সততা ও সত্যবাদীতার পথ অনুসরণ করতে হয়। সত্য ও সততা থাকলে মানুষের মধ্যে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি থাকবে না। কেউ দুর্নীতি করবে না, ঘুষ নিবে না, অবৈধ উপায়ে উপার্জনের চেষ্টা করবে না। সবাই সুন্দর ও স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সততা ও সত্যবাদিতার গুরুত্বঃ প্রত্যেক ধর্মেই সত্যের পথ অনলম্বন করতে আর সৎ উপায়ে উপার্জন করতে বলা হয়েছে। যাবতীয় কলুষতা দূর করে নিষ্কলঙ্ক জীবনযাপন করতে প্রত্যেক ধর্মই সততা ও সত্যবাদিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম ধর্মেও এ গুণটির সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহম্মদ (স.)  বলেন,

“সত্যবাদিতা সুকর্মের পথ দেখায় আর সুকর্ম বেহেস্তের পথ দেখায়।”

সততা ও সত্যবাদিতার উপায়ঃ শিশুকাল থেকে সততা ও সত্যবাদিতার শিক্ষা দিতে হবে। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের এ গুণটির আদর্শকে ধারণ করতে অনুপ্রাণিত করতে হবে। আর আমাদের ব্যক্তি জীবনের প্রাত্যহিক কাজকর্মে এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সৎ ও সত্যবাদী জীবনকে আদর্শ জীবনরূপে গ্রহণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারলেই জীবনের সার্থকতা।

সততা ও সত্যবাদিতার দৃষ্টান্তঃ যুগে যুগে মহা মনীষীরা সত্য ও সত্যবাদিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁরা সত্যকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে জীবনকে মহিমান্বিত করেছেন। তাঁরা সমাজে সত্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সাধনা করেছেন। হযরত মুহম্মদ (স.)  সারাজীবন সত্যের পথে ছিলেন ও সত্য প্রচার করেছেন। সত্যের মাধ্যমে তিনি মানুষের মন জয় করেছিলেন। মনীষীরা তাঁদের কাজ-কর্মে সত্যবাদিতার পরিচয় দিয়েছেন। এক্ষেত্রে হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) –এর সত্যবাদিতার কাহিনী চমকপ্রদ।

সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ: সত্য অর্থ খাঁটি, সঠিক, নির্ভুল, বাস্তব, যথার্থ, প্রকৃত, আসল ইত্যাদি। অপরদিকে মিথ্যা অর্থ অসত্য, ভুল, অবাস্তব, অযথার্থ, অমুলক, কল্পিত, নিষ্ফল, অনর্থক ইত্যাদি। অর্থাৎ সত্যের বিপরীত রূপ হলো মিথ্যা। সুতরাং সত্য ও মিথ্যার কাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন বা পৃথক এবং এ দু’টি বিপরীতধর্মী বিষয়। আবার এ দু’টির সংমিশ্রণ বা সংযোজন বিশুদ্ধ কোন কিছুর উদ্ভব করতে সক্ষম নয়। তাই ইসলামে সত্য ও মিথ্যার সংমিশ্রণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

মহান আল্লাহ বলেন, 

           “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বে সত্যকে তোমরা গোপন করো না।”

উপসংহারঃ সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। সত্য কখনো চাপা থাকে না। সত্য সকল প্রতিকূলতাকে জয় করে তার স্বরূপে ফিরে আসবে। সততা ও সত্যবাদিতা হবে সকল অন্যায়-অত্যাচার, খারাপ কাজের বিরুদ্ধে হাতিয়ার। সততা ও সত্যবাদিতার আলোকে সমাজকে আলোকিত করতে হবে। সত্যের সাথে কোনো অন্যায়, অসৎ কাজ জয়ী হতে পারেনা।

Tags: